একটি শিক্ষা সফর এবং কিছু স্মৃতিকথা ( A study tour and some memories) #৩

পর্ব ৩: সমুদ্র

আকাশে বিশাল এক চাঁদ। সুন্দর জোছনা। সমুদ্রের পানিতে আলো আঁধারির খেলা। চাঁদ দেখা কমিটির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে অক্ষরে অক্ষরে। তার মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সহ মোট ৩১টি প্রাণ যেন নতুন এক বাতাস খুঁজে পেল নিশ্বাসের জন্য, নতুন জীবন খুঁজে পেল পুরাতন খোলসের মধ্যে। ওয়ারফেজ এর “অবাক ভালোবাসা” গানের প্রতিটি লাইন যেন সবগুলো মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে গেল।

“সব বেদনা মুছে যাক আঁধারে, শুধু জেগে থাক ওই দূরের তারারা। সব শব্দ থেমে যাক নিস্তব্ধতায়, শুধু জেগে থাক এই সাগর আমার পাশে।”

কিছুক্ষন ছোটাছুটি করে ফিরে এল সবাই রাতের ডিনারের জন্য। সারাদিনের ধকলের পর বীচের অসাধারন আবহাওয়া যেকারো ভোজন রুচিকে চাঙা করার জন্য যথেষ্ট। ক্লান্ত শরীরকে সকালের জন্য ফুল চার্জ করতে হোটেলে ফিরে এল সবাই ঘুমের জন্য। 

ঘুম ভাংলো দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে। ঘড়িতে সোয়া পাঁচটা। “সুর্যোদয় দেখতে চাইলে বীচে যা।” দরজা খুলে দেখি মোটামুটি সবাই রেডি বীচের দিকে যাবার জন্য। বাইরে তখন চার্জ প্রায় শেষ হয়ে আসা লাইটের আলোর মত আলোকিত। নিজের হাত আবছা মতন দেখা যায়। 

বেরিয়ে গেলাম সবাই কামরুল ভাইকে সাথে নিয়ে। বীচে পৌঁছতে পৌঁছতে তখন বেশ আলো ফুটেছে। কিন্তু মেঘলা আকাশে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে না সরাসরি। অনেকেই তখন হাঁটু পানিতে। কয়েকজন কফির কাপ নিয়ে ব্যস্ত। আর কয়েকজন রেডি হচ্ছে দৌঁড় প্রতিযোগিতার জন্য, কেননা মেঘলা আকাশের ছবি তুলে সূর্যোদয় ক্যাপশন দেয়া ব্যাপারটা একটা ফান পোস্ট হয়ে যায়।

কামরুল ভাই শিস বাজালেন। সাত জনের মধ্যে আমিও দৌড় লাগালাম। প্রথম শাওন, তারপর সাব্বির আর তৃতীয় আমি। কামরুল ভাই পুরস্কার ঘোষনা করলেও সেই পুরস্কারের দেখা আর আমাদের কপালে জোটেনি। 

দৌঁড় শেষ হলে দেখি দুরের নারিকেল গাছের মাথায় সূর্য তার মিষ্টি আলো নিয়ে উঁকি দিচ্ছে। সবাই অবাক হয়ে সূর্যোদয় দেখলাম। বহু প্রতিক্ষিত হাজার বছরের পুরোন সূর্যের নতুন করে উদয়। হোটেলে ফিরে এলাম। 

এরপর সকালে পরোটা ভাজি ডাল এবং ডিম দিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই গেলাম সুগন্ধা বীচ এ। জল এর সাথে মানুষের যেন কোথাও একটা চিরচেনা টান আছে। তাই জলে যে প্রথম নামে সেও যেমন শরীরে একটা অদ্ভুত কম্পন অনুভব করে, যে বহুবার নেমেছে তার হাসিটাও ওই একই রকম কম্পনের আভাস দেয়। 

শুরুটা হলো হাত ধরে লাইন করে জলে নামা দিয়ে। এরপর ঢেউ এর সাথে লুকোচুরি খেলা, টায়ার ভাড়া করে জলে ভেসে থাকার খেলা, নোনা জল আর বালিতে চোখ জ্বালা করার খেলা, এবং সবশেষে জল থেকে উঠে আসার সময় বিশাল সমুদ্র আদর করে আমার চশমাখানা রেখে দেয়ার খেলা।

শরীর আর পকেট ভর্তি বালি নিয়ে অন্ধের মত হাতড়ে হাতড়ে উঠে আসলাম কুলে। নিলয় সাথে ছিল। রোদ তখন মাথার উপরে। নোনা জল শরীরে শুকিয়ে শরীরের চামড়া শুটকি মাছের মত পুড়ে কালো হচ্ছিল ততক্ষনে। কখন যে তিনটা ঘন্টা পার হয়ে গেলো তার খবর নেবার কেউ ছিলো না। হোটেলে ফিরে এসে পকেটের বালি পরিস্কার করলাম। বালিতে বাথরুমের পয়ঃনিস্কাশন পাইপ এর মুখ বন্ধ হয়ে জল জমে আমাদের রুমেরও কিছুটা ভেসে গেল।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে ব্যাগের ভেতর আবিষ্কার করলাম আমার পুরাতন সঙ্গী আরেকখানা চশমা। সবাই যখন খাবার জন্য রেডি হচ্ছে তখন আমি আর অনি রুমের দরজা লাগিয়ে ভিডিও করলাম আমার প্রথম গিটারে তোলা গান, “তুমি আর তো কারো নও শুধু আমার।” ফেসবুকে আপলোড করতে দিয়ে আমরা খাবার হোটেলে চলে আসলাম।

হোটেলে খাবার নিয়ে সে কি এক নাটক! এত মানুষের মাছে অরুচি থাকতে পারে, জানা ছিল না। কে বলে মাছে ভাতে বাঙ্গালী? বলতে হবে মাংসে ভাতে বাঙ্গালী। কক্সবাজারে এসেও একদল মানুষ মাছ না খেয়ে মাংস দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিল। এর পরপরই চাঁদের গাড়িতে চড়ে বেরোলাম ইনানি বীচের দিকে। 

ইনানি বীচে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য প্রায় ঝাউয়ের বনের আড়ালো চলে গেছে। প্রবাল আর সাগরের ঢেউয়ের এই নতুন রূপ আর তার সাথে সূর্যাস্তের অপার সৌন্দর্য আর পাগল করা বাতাসে কেউ আর নিজের জগতে ছিলো না। 

সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুললাম অস্তগামী সূর্যের সাথে। তারপর আবার চাঁদের গাড়িতে করে ফিরলাম হিমছড়িতে। কিন্তু দূর্ভাগ্য এমনি যে চাঁদের গাড়িতে বসেই সূর্য টাটা বাইবাই দিয়ে চারিদিক অন্ধকার করে ডুবে গেলো। হিমছড়িতে নামা হলো না আর। ফিরে এলাম হোটেলে।

তারপর সবাই গেলো বার্মিজ মার্কেট এ। বার্মিজ আচার, লুঙি, গামছা, চাদর, খামি ইত্যাদি কিনে যখন সবাই হোটেলে এল তখন সবার পকেটে ছুঁচো ডিগবাজি দিচ্ছে। রাত তখন ১১ টা। ডিনার সেরে সবাই আবার হোটেলে ফিরলো। একদল তখন ব্যস্ত বারবিকিউ এর আয়োজনে। রাত ১২টায় হোটেলে ছাদে শুরু হলো বারবিকিউ। আটটা মুরগি যখন আগুনের আচে ঝলসানো হচ্ছে তখন সবার চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা। কক্সবাজারের নোনা পানি যেন সবার শক্তিটুকু শুষে রেখে দিয়েছে।

বারবিকিউ হলো কিন্তু পার্টি আর হলো না। খাওয়াদাওয়া করে সবাই গিয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল। এদিকে আমি, নিলয় আর কামরুল ভাই বসলাম হিসাবের খাতা নিয়ে। কিন্তু এই অবস্থায় হিসাব কি আর মেলে? শরীর একজায়গায় তো সেন্স অন্য জায়গায়। কখন ঘুমিয়ে গেলাম টের পাইনি। সকালে উঠে শুনলাম বীর বিক্রম নিলয় দাস হিসাব নিকাশের ইতি টেনেছেন ব্যাপক পরাক্রমের সাথে। শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন বাসে করে যেতে হিবে চিটাগং।

বাস ছাড়লো সকাল সাড়ে আটটায়। চিটাগং পৌঁছালাম বেলা ১১টায়। চিটাগাং মেডিকেল কলেজে যাওয়ার পর সেখানকার মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনায় নিজেদেরকে নতুনভাবে খুঁজে পেলাম। এই কয়টাদিনের মধ্যে এবারেই প্রথম মনে হলো আমরা শিক্ষা সফরে এসেছি। আমাদের শিক্ষা জীবন নামক একটা কিছু আছে! 

প্রথমেই চিটাগাং ডেন্টাল কলেজের সিনিয়র এবং প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা আমাদের বাসকে একটা পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েই আমাদেরকে নিয়ে গেলেন চিটাগাং ডেন্টাল ইউনিটের প্রধান ডঃ মোর্শেদ মাওলা স্যারের কাছে। সেখানে পরিচয় পর্ব শেষ করেই স্যার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদেরকে দেখালেন ওপিডি, প্রোস্থোডন্টিকস ল্যাব এবং ওয়ার্ড। রোগীদের সাথে তাদের ব্যবহার, ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি সবকিছুই আমাদেরকে মুগ্ধ করালো। আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের সাথে পরিচিত হয়ে দুপুরের খাবারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। দুপুরের খাবারটাও চট্টগ্রাম ডেন্টাল ইউনিটের পক্ষ থেকেই পেলাম। এবং খুব দ্রুত দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে চট্টগ্রাম পর্বের ইতি টানলাম আমরা।

আমাদের বাস ছাড়লো বিকেল পাঁচটায়। বেলা ডুবে যেতে থাকলো আর বাড়তে লাগলো আমাদের ব্যস্ততা। লটারির টিকেট বিক্রির ব্যস্ততা। ১০০ টিকেট বিক্রির জন্য নানা রকম অফার দেয়া হলো। একটি কিনলে দুটি ফ্রি, তিনটি কিনলে পাঁচটি ফ্রি। ৪০ টাকার একটি টিকেট পাচ্ছেন ৫০ পারসেন্ট ডিসকাউন্টে, ইত্যাদি! ইত্যাদি!! সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হলো র‍্যাফেল ড্র। শারদুল স্যার, পপি আন্টি, মারিয়া ম্যাম (শারদুল স্যারের স্ত্রী) আর কামরুল ভাই মিলে টিকেট এর নাম্বার বলা শুরু করলেন। বেরিয়ে এলো ১০ জন বিজয়ী। তবে নাম্বার গুলো ডাকার সময় একেকজনের চেহারায় উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার ছাপ গুলো ছিলো দেখার মত। এবং আনন্দের সংবাদ এই যে, আমি জীবনে সেবারই প্রথম লটারিতে পুরস্কার জিতলাম। তাও প্রথম পুরস্কার। ২৫০ টাকা দামের একটি দেয়ালঘড়ি।

এর পরেই হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাসের সব ছাত্র ছাত্রীরা গান গাইলো, কবিতা বললো, কৌতুক বললো। পেরিয়ে গেলো অনেকটা সময়। যারা জীবনে দরকার ছাড়া কোনদিন মুখও খোলে নি তারাও বিনোদনের বন্যা বইয়ে দিলো। 

রাত ১২টায় কলেজের সামনে বাস থামলো। ক্লান্তির ছাপ পেরিয়ে সবার মুখে আনন্দ আর বেদনার মাঝামাঝি একটা রুপ যেন পলকেই মনে করিয়ে দিচ্ছিলো একসাথে কাটানো ৫ টা দিন আর ৬ টা রাতের সবটুকু। শারদুল স্যার আর মারিয়া ম্যাম মিলে সবাইকে সিএনজি আর রিক্সায় তুলে বিদায় জানালেন। অবশেষে বিদায় নিলেন তারাও।

শেষ হলো ১৯ তম ব্যাচের স্টাডি ট্যুর। অনেক শেখা, অনেক দেখা অনেক আনন্দের এই মূহুর্ত গুলোই সাক্ষী হয়ে রইলো একটি ব্যাচের দৃঢ় বন্ধনের।

শেষ বেলায় একটি কথাই বারবার মনে হলো:

” বন্ধু মোরা থাকবো না তবু থাকবে মহাকাল

বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক আমাদের চিরকাল।”

Published by dr_shukanta

Writer, blogger, poet, musician, dentist, web designer.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Create your website with WordPress.com
Get started
%d bloggers like this: