একটি শিক্ষা সফর এবং কিছু স্মৃতিকথা ( A study tour and some memories) #২

পর্ব ২ঃ যাত্রাকাল

আমরা যখন মনে মনে কক্সবাজারের বাতাসে গাঁ ভাসাচ্ছি তখন নতুন এক সমস্যার উদয় হলো। কলেজ থেকে বলা হলো, গাইড হিসেবে ছেলেদের জন্য একজন পুরুষ শিক্ষক আর মেয়েদের জন্য একজন নারী শিক্ষককে সাথে নিতে হবে। যদিও তাদের খরচ কলেজ থেকেই বহন করবে। 

এবার আমাদের প্রথম চিন্তা হলো এই যে, আমরা যাচ্ছি ব্যাচ ট্যুরে, সেখানে শিক্ষকরা কেন যাবেন? এবং দ্বিতীয় চিন্তা হলো, শিক্ষক কাউকে যদি নিতেও হয় কাকে নেয়া যায়? 

আমরা যখন চিন্তা করছি গাইড হিসেবে কাকে নিলে আমরা ইচ্ছামত মজা করতে পারব তখন দুঃসংবাদ দিল সাজিদ হাসান। ও বলল, সাথে নিয়ে যাবার মত কোন শিক্ষককে রাজি করানো যাচ্ছে না পেশাগত কারনে। এবার হতাশার পালা ভারী হতে থাকল। সব কিছু রেডি করে, এত প্ল্যান করে, গাইড হিসেবে কাউকে পাচ্ছি না দেখে ট্যুর ক্যান্সেল হবে এর চেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে! অবশেষে মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট এর শারদুল ই জাহান স্যার আর লাইব্রেরিয়ান পপি আন্টি আমাদের গাইড হিসেবে যেতে রাজি হলেন। সাথে আরও যাবেন শারদুল স্যার এর স্ত্রী মারিয়া ম্যাম। 

সব কিছু ঠিক ঠাক। টিশার্ট এর দ্বায়িত্ব নিলাম আমি, নিলয় আর শাওন। ছয় ঘন্টা বাজার ঘুরে অবশেষে টিশার্ট এর অর্ডার দেয়া হলো। বাসায় পৌঁছলাম রাত পৌনে এগারোটায়। সকাল ৭টায় খেয়ে বেরিয়ে রাত ১২ টায় ডিনার করাটা এক সপ্তাহের রুটিন হয়ে গিয়েছিলো আমাদের কয়েকজনের।

এর মধ্যে ঠিক করা হলো র‍্যাফেল ড্র করা হবে। র‍্যাফেল ড্র এর টিকেট ডিজাইন করে সাব্বির রহমান আর নাঈম মৃধাকে দ্বায়িত্ব দিলাম র‍্যাফেল ড্র ডিপার্টমেন্ট এর। দুজন বাদে কেউ জানতো না কি থাকছে পুরস্কার আর কিভাবে হচ্ছে সব।

অবশেষে এলো নয় তারিখ। রাত ১১ টায় বাস। মেয়েরা ৩-৪ দিন আগে থেকে কেনাকাটা শুরু করলেও কমিটি ও তার বর্ধিত মেম্বাররা নিজেদের জন্য ভাবার সময় পায়নি এতটুকু। শেষমেশ ৯ তারিখেই সবাই দৌঁড়াও মার্কেটিং এ। সারাদিন টুকটাক কেনাকাটা শেষ করে বিকেলের মধ্যে রেডি সবাই।

বাস এলো সাড়ে দশটায়। সবাই বাসে উঠলো একে একে। বাস ছাড়ার পরই একটা হোঁচট খেলাম।। পেনড্রাইভ আনতে ভুলে গেছি আমরা,আর তাই অগত্যা সারারাত গলা ফাটিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেই রাত পার করে ফেললাম। 

সকাল বেলায় আঁকাবাঁকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম পাহাড়ের শহর রাঙামাটি। সবার আনন্দ তখন দেখে কে! কারো কারো জন্য এটাই জীবনের প্রথম ট্যুর। আমরা সত্যিই যে এতগুলো মানুষ মিলে একসাথে রাঙামাটি চলে আসলাম সেটা তখনও বোধ করতে পারছিলাম না।

সে যাই হোক, ট্যুরের প্রথম পর্ব শুরু হলো। কামরুল ভাই আমাদের নিয়ে উঠলেন হোটেল গ্রীন ক্যাসেল এ। হোটেলে চেক ইন দিয়ে,  লাগেজ রেখে, ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়লাম কাপ্তাই লেকের পথে। উদ্দেশ্য শুভলং ঝর্ণা।।

ট্রলারে করে কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আর ছবি তুলতো তুলতে অনেকের ফোনের চার্জ নেমে এলো শূন্যের কোটায় কেননা সারারাত তো চার্জ দেয়ার জায়গা পাওয়া যায় নি। আর পাওয়ার ব্যাংক নামক বস্তুটাও তখন সবার হাতের নাগালে ছিল না। 

শুভলং ঝর্নার কাছাকাছি আসতেই কামরুল ভাই বললেন, “পানি নাই”। আমরা বুঝলাম না একটা ঝর্নায় পানি থাকে না কিভাবে! দেখলাম পাহারের গাঁ বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে। কি আর করা? যা পাওয়া গেছে তাই শান্তনা। শুভলং ঝর্ণার জলে গাঁ ভেজানো হলো না। টিলার আশেপাশে ঘুরে এসে এবং দাঁড়িয়ে থেকে কিছু ছবি তুলে নিয়ে আবারও বেরিয়ে পড়লাম শুভলং বাজার এবং আর্মি ক্যাম্প দেখতে।

কিন্তু বিধিবাম! ক্যাম্প তো সেই পাহাড়ের চূড়ায়। আর পাহাড়টাও প্রায় ১৫০০ ফুট উঁচুতে। তারপরও আমাদের ভিতর ৩ টা মেয়ে এবং সকল ছেলে উঠার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করলাম। ব্যর্থ বললাম কারণ একদম শেষ মুহূর্তে সময়ের অভাবে নেমে আসলাম পাহাড়ের চূড়া থেকে। বলে রাখি এই পাহাড়ের চূড়ার অর্ধেক পথ থেকেই কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য যেনো হাজার গুণে বেড়ে গিয়েছিলো। পাখির চোখে দেখতে পারছিলাম পুরো এলাকা। 

আবার ট্রলারে করে বেরিয়ে পড়লাম অন্য একটা ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। এতক্ষণ রোদে থাকায় এবং পাহাড় বাওয়ায় শরীরের এনার্জি লেভেল অনেকটা কমে গেছে। নতুন ঝর্নায় পৌঁছলাম আধঘন্টার ভেতরে। আশার কথা হচ্ছে, এবারে ঝর্নার পানি আগের তুলনায় কিছুটা বেশি। তাই মনে কিছুটা আনন্দের সঞ্চার হলো। ঝর্ণার পানিতে আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠলাম আমরা।

পেটের ভিতর ছুঁচো ততক্ষণে বুক ডন দিচ্ছে। ট্রলার নিয়ে চলে গেলাম লেকের ভিতর “মেজাং” নামক রেস্টুরেন্টে। খুব নিরিবিলি একটা পরিবেশ। দীপের মত একটা জায়গা, সেখানে দুই তিনটা ঘর নিয়ে একটা হোটেল। আর আশেপাশে দু একটা চা-পানের দোকান। সেখানকার জনপ্রিয় কয়েক পদের খাবার দিয়ে শেষ করলাম খাওয়া দাওয়া পর্ব। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য টাকি মাছের ভর্তা এবং কাঁচা মোটা বাঁশের ভেতরে রান্না করা মুরগীর মাংস। এবং এর সাথে বালাচাও এর মত করে ভাজা গুড়ো চিংড়ি। সেই খাবারের স্বাদ যে জীবনে একবার মাত্র খেয়েছে সে আর ভুলতে পারবে না। তবে বারবার খেলে বিশেষ কিছু মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক। একেকজন পেটে হাত বুলিয়ে বের হয়ে আসলাম হোটেল থেকে। এবারের গন্তবত কাপ্তাই লেক এর ঝুলন্ত ব্রীজ।

“মেজাং” এর সামনে জামাল এবং জামালী 🙂

ভরপেট খাওয়া এবং এনার্জি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ঘুমে চোখ তখন ঢুলুঢুলু আমাদের। সূর্য পড়ে এসেছে অনেকটাই। ট্রলারের ছুই এর নিচে অন্ধকার। তার সাথে আমাদের কয়েকজনের গুনগুন করে গান গাওয়া আর বাকিদের তালে তালে শরীর দোলানো। কি অদ্ভুত একটা সন্ধ্যা ছিল। আলো পড়ে আসায় একটু শীত শীত লাগছিল। বিকালের মৃদুমন্দ বাতাসের সাথে সাথে আমরা সবাই চলে আসলাম ঝুলন্ত ব্রীজে। এবং ওখানেই শেষ হলো ঘোরাঘুরি অধ্যায়ের প্রথম পর্ব। সন্ধার পরপরই হোটেলে ফিরে আসলাম আমরা।

পরদিন ঘুম থেকে সকাল ৬টায় উঠে বেরিয়ে পরলাম বান্দরবনের উদ্দেশ্যে। পার্সেল আনা নাস্তা দিয়ে বাসের ভিতরই শেষ করলাম ব্রেকফাস্ট। যাত্রাবিরতী দিলাম বান্দরবনের স্বর্ণমন্দিরে। অনুমতি না থাকায় আমাদের ভিতর একমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী সুস্মিতাই দেখতে পারলো স্বর্ণমন্দিরের অপরুপ সৌন্দর্য। ওর ফোনে ছবি দেখে আমাদের আফসোসের পাল্লা ভারি হলো বলা বাহুল্য। দুপুর নাগাদ পৌঁছলাম হিল ভিউ হোটেলে। চেকইন দিয়েই দুপুরের খাবার শেষ করলাম হোটেলের নিচের খাবার দোকানে। খাবার মেন্যু ছিল খিচুড়ি আর মুরগীর মাংস। এরপর দুটো চাঁদের গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম নীলাচলের রুপ উপভোগ করতে।

পাহাড়ি পথে চাঁদের গাড়ির ছাদ থেকে মাথা তুলে চারপাশ দেখতে শুরু করলাম। বিকেলের রোদ পড়ে যাওয়া নীলাচল যেন এক স্বর্গ। সৃষ্টিকর্তার নিজের হাতে করে বানানো একটা জায়গা। আঁকাবাঁকা রাস্তা আর দুপাশে যতদুর চোখ যায় মেঘের সারি। নিচের দিকে চোখ দিলেই অনেক নিচে দেখা যাবে কিছু টিলা এবং সুতার মত আঁকাবাঁকা রাস্তাঘাট। তবে এতটা পথ এলাম কিন্তু খুব একটা বাড়িঘর দেখা গেল না। যদিও নীলাচল নামক জায়গায় প্রবেশের পরেই একটা পিকনিক স্পট এর অনুভূতি পেলাম। ছোট ছোট কটেজ। চারপাশে গ্রিল দিয়ে বেড়া দেয়া। টয়েলেট, খাবার দোকান। প্রাকৃতিক বিষয়টা যেন খানিকটা মিইয়ে গেল। তবুও যা দেখছিলাম তাতেই চোখ আর মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল।

এখানে বিকেল পার করলাম। সূর্যকে মেঘের উপর থেকে দেখলাম। দেখলাম মেঘের উপরেও কিভাবে মেঘ থাকতে পারে। অনেক ছবি তুললাম। বাতাসে শরীর ঠান্ডা করে নিলাম। নীলাচলের অপরূপ সৌন্দর্যে নিজেদের মনকে রাঙিয়ে সন্ধার ঠিক আগমুহূর্তে চলে আসলাম হোটেলে। 

সন্ধ্যার পর সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম কিছু শপিংয়ের জন্য। শপিং শেষে ডিনার করে রাতে হোটেলে ফিরেই ঘুম। কারণ পরেরদিন খুব সকালে উঠতে হবে। নীলগিরির মেঘ দেখতে যত সকালে যেতে পারবো ততই ভালো।

সকাল ৬টায় চাঁদের গাড়িতে করে আবার বেরিয়ে পড়লাম আমরা সবাই। ২.৩০ ঘন্টার ভয়ংকর সুন্দর জার্নি আর চারপাশে জমাট বাঁধা মেঘের ভেতর দিয়ে আমরা পৌঁছলাম নীলগিরিতে। প্রকৃতি যেনো নীলগিরিকে সাজাতে এতটুকু কার্পন্য করেনি। এই জায়গাটাও নীলাচলের মত। তবে আমার কাছে কেন জানি নীলাচলকেই বেশি সুন্দর মনে হলো। প্রথমে নীলাচলকে দেখেছি একারনেও হতে পারে।

নীলগীরিতেও কাটালাম দুপুর অবধি। হোটেলে ফিরে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মেঘলার উদ্দেশ্যে। মেঘলা একটা কৃত্রিমভাবে বানানো পিকনিক স্পট। সেখানে আছে ঝুলন্ত ব্রীজ,ক্যাবল কার আর ছোট্ট পাহাড়ি লেক। মেঘলায় এসে মেয়েদের আনন্দ দেখে কে। এতক্ষন পরে হয়তো তারা তাদের মত একটা জায়গা খুঁজে পেল। এবার ছেলেরা ঝিম দিয়ে গেল আর মেয়েরা পাখির মত সরব হয়ে গেল। তবে এখানে এসে জীবনে প্রথম কেবল কার এ উঠলাম। ব্রীজটা খুবই সুন্দর ছিল। তার সাথে আমরা চারজনে মিলে একটা প্যাডেল করা বোট ভাড়া করলাম। ঘুরে আসলাম লেকের চারপাশ থেকে। মাঝপথে এসে আমাদের প্যাডেলে কোন একটা যান্ত্রিক ত্রুটি হলো এবং প্যাডেল হাত দিয়ে ঘুরিয়ে কুলে ফিরতে হলো। 

মেঘলায় ঘোরা শেষ করেই আমরা বান্দরবনের পর্বের ইতি টানলাম। সেদিন ছিল ১২ তারিখ। সন্ধ্যায় আমাদের রিজার্ভ বাসে চড়ে রাতে পৌঁছলাম কক্সবাজার। হোটেল এলবাট্রস এর সামনে যখন বাস থামলো তখন প্রায় রাত সাড়ে আটটা। কারো শরীরে তখন নিজের ব্যাগটা টেনে নেয়ার মত শক্তিও নেই। হেলতে দুলতে হোটেলে ব্যাগগুলো কোনরকম রেখে দৌঁড় লাগালাম বীচের দিকে। 

আরো কিছু ছবিঃ

তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Published by dr_shukanta

Writer, blogger, poet, musician, dentist, web designer.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Create your website with WordPress.com
Get started
%d bloggers like this: